বাংলা সাহিত্যর জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মূলত তার লেখার মাঝে প্রকৃতির সৌন্দর্য, দুর্বষহ মানবজীবনে আনন্দের চিত্র লালন করেন। তার উপন্যাসগুলোর মাঝে পথের পাঁচালী,অপরাজিত,আরণ্যক, চাঁদের পাহাড়, আদর্শ হিন্দু হোটেল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিহারে তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে ‘আরণ্যক’ উপন্যাসটি রচনা করেন। ১৯৫০ সালে অরণ্যের পথিক পরলোকগমন করেন।
রাজু পাঁড়ে, রাসবিহারী সিং কিংবা নন্দলালের মতো মানবচরিত্রের সংমিশ্রণ ঘটলেও প্রকৃতি তথা অরণ্যই যেন হয়ে উঠেছে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র।
কাহিনী সংক্ষেপঃ
শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে বেকার জীবন কাটানো সত্যচরণের অরণ্য জীবনে প্রবেশের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। কলকাতার কোলাহল পেরিয়ে ভাগলপুরের পূর্নিয়ায় বন্ধুর বাবার জমিদারি স্টেটের বিশাল বড় অরণ্যে ভূমির ম্যানেজারির দায়িত্ব পালন করতে গল্প কথক চলে যান অরণ্যের বুকে। শুরুর দিকে ব্যস্ত নাগরিক জীবন, চিরচেনা পথঘাট,বন্ধু-বান্ধব, থিয়েটার কিংবা অভ্যাস ফেলে সভ্যতার ছোঁয়া বঞ্চিত, প্রায় জনমানবশূন্য শান্ত অরণ্যে জীবন কাটানো দুর্বষহ মনে হলেও ধীরে ধীরে তিনি অভ্যস্ত হয়ে উঠেন এই সুনশান নীরবতার জীবনে। পরিচিত হতে থাকেন অরণ্যের সাথে, পরিচিত হোন অরণ্যের অভাবী মানুষের জীবন যাপনের সাথে, পরিচয় ঘটে কিছু স্বার্থলোভী মানুষের সাথে, ব্যথিত হোন ২-৩ মাস ধরে ভাত না পেয়ে ছাতু খেয়ে থাকা অভাবী মানুষের ভাতের খোঁজে মাইলের পর মাইল হেঁটে আসার গল্প শোনে।
অরণ্য এমন এক জায়গা যেখানের মানুষ কলাইয়ের ছাতু, পাহাড়ি ফল-মূল, বিভিন্ন ধরনের শাক, মকাই খেয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেন। নিত্যদিনের অভাবে জীবন দুর্বষহ হয়ে উঠলেও ফেলে যান না চিরচেনা জঙ্গলের পথ,
বাঘ,ভাল্লুক, নীলগাই, সাপ কিংবা অন্যান্য জন্তুর ভয়।
সবকিছুকে ছাপিয়ে গল্পকথক একদিন এই অরণ্যের মোহে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন, আশ্রয় খুঁজে পান অরণ্যের বুকে।
পাঠ-প্রতিক্রিয়াঃ
যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে নির্জনতায় বসবাস করার যে তীব্র বাসনা হৃদয়ের আঙিনায় মাঝে মাঝেই জেগে ওঠে অস্হির করে তুলে হৃদয়কে বইটি যেন সস্নেহে অরণ্যের নিরিবিলি বুকে খানিকটা আশ্রয় খুঁজে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
পছন্দের কিছু বাক্যঃ
১. প্রকৃতি তার নিজের ভক্তদের যা দেন, তা অতি অমূল্য দান। অনেক দিন ধরে প্রকৃতির সেবা না করিলে কিন্তু সে দান মেলে না। আর কি ঈর্ষার স্বভাব প্রকৃতিরাণীর- প্রকৃতিকে যখন চাহিব তখন প্রকৃতিকে লইয়াই থাকিতে হইবে,অন্য কোনো দিকে মন দিয়াছি যদি অভিমানিনী কিছুতেই তার অবগুণ্ঠন খুলিবেন না।
২. এই অরণ্যপ্রকৃতিকে ধ্বংস করিতে আসিয়া এই অপূর্ব-সুন্দরী বন্য নায়িকার প্রেমে পড়িয়া গিয়াছি।যখন ঘোড়ায় চড়িয়া ছায়াগাহন বৈকালে কিংবা মুক্তাশুভ্র জ্যোৎস্নালোকে উদাস আত্মহারা,শিলাস্তৃত ধূ ধূ নির্জন বন্য প্রান্তর! কি করিয়াই আমার মন ভুলাইয়াছে এ চতুরা সুন্দরী!
৩.মনে হয়, কতক্ষণে জঙ্গলের মধ্যে ফিরিয়া যাইব, কতক্ষণে আবার সেই ঘন নির্জনতার মধ্যে, অপূর্ব জ্যোৎস্নার মধ্যে, সূর্যাস্তের মধ্যে, দিগন্তব্যাপী কালবৈশাখীর মেঘের মধ্যে, তারাভরা নিদাঘ-নিশীথের মধ্যে ডুব দিব!
বইটির ভালো দিকঃ
অভ্যস্ততা মানুষকে এমন করে তুলে যে একসময় শহুরে জীবন কাটানো মানুষ যে নির্জন অরণ্যের প্রতিকূলতায় টিকে থাকার কথা ভাবতেও পারে না একদিন স্বেচ্ছায় সেই প্রতিকূলেই আজন্ম কাটাতে চায়, হারিয়ে যায় গহীন অরণ্যের অতলে।
পাঠক-সমালোচনাঃ
বইটির সমালোচনা করার মতো যোগ্যতা আমার মতো নগন্য কারোর নেই। বর্তমানের অল্পবয়সী পাঠকের কথা বিবেচনা করে যেটুকু না বললেই নয় ততটুকুই বলছি।
গুরুগম্ভীর ভাষা এবং অজানা অসংখ্য কঠিন শব্দে রচিত এই বইটি এ সময়ের অল্পবয়সী পাঠকদের অরণ্যে হারিয়ে যেতে খানিকটা বাধাগ্রস্হ করলেও করতে পারে। তবে একবার অরণ্যের মুক্ত বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করলে সকল প্রতিকূলতা ছাপিয়ে তাদের চঞ্চল হৃদয় অরণ্যে হারিয়ে যেতে উদগ্রীব হয়ে উঠতে বাধ্য হবে।
বইটি কেন পড়বেন?
লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় “আরণ্যক” উপন্যাসে অরণ্য জীবনকে অনন্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলা সাহিত্যের গৎবাঁধা মূল চরিত্রের বাইরে গিয়ে তিনি মূল চরিত্রে অরণ্যের ছবি এঁকেছেন এবং তার নৈসর্গিক বর্ণনায় পাঠকসমাজকে মোহিত করতে চেয়েছেন। লেখকের লেখনশৈলী পাঠককে নিয়ে যাবে আরণ্যিক পরিবেশের আনাচে কানাচে ৷ বইটিতে প্রত্যেকের মনোজগতে সাজানো নির্জন অরণ্যে কোলাহলমুক্ত জীবনযাপনের চিত্র খুঁজে পাবে।
শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে নয় বরং চরিত্রগুলোর সাথে গল্প কথকের জীবনযাপন কেমন হয়ে উঠেছিল, কথকের মন কোনো নারী চরিত্রের প্রেমে পড়েছিল কিনা,”হে অরণ্যা নীর আদিম দেবতারা, ক্ষমা করিও আমায়” কথক কেন একথা বলেছিলেন এসব জানতে হলেও বইটি পড়তে হবে।
সর্বোপুরি,যেকোনো বয়সের পাঠকের পড়ার উপযোগী এই বইটি।
বইটি সম্পর্কে লেখকের কিছু কথাঃ
“এই জঙ্গলের জীবন নিয়ে একটা কিছু লিখবো–একটা কঠিন শৌয্যপূর্ণ, গতিশীল ব্রাত্য জীবনের ছবি। এই বন, নির্জনতা, ঘোড়ায় চড়া, পথ হারানো –অন্ধকার– এই নির্জনে জঙ্গলের মধ্যে খুপরি বেঁধে থাকা। মাঝে মাঝে…পথ হারানো,রাত্রের অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে ঘোড়া করে ঘোরা, এদেশের লোকের দারিদ্র, সরলতা, এই virile, active life, এই সন্ধ্যায় অন্ধকারে ভরা গহীন বন,ঝাউবনের ছবি– এই সব।”
আপাতত দৃষ্টিতে সাহিত্য সমালোচকরা একে ভ্রমণ বৃত্তান্ত বললেও লেখক নিজেই বলেছেন,”ইহা ভ্রমণবৃত্তান্ত বা ডায়েরি নহে–উপন্যাস।”
বইটি সম্পর্কে আরও কিছু কথাঃ
ভারতের সাহিত্য আকাদেমি “আরণ্যক”কে বাংলাভাষায় রচিত দশটি শ্রেষ্ঠগ্রন্থের মাঝে স্হান দিয়েছেন। এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে বইটি।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাস সমগ্র আপনার কাছে কেমন লেগেছে কমেন্ট করে জানাবেন.